লেখক সিরাজুল ইসলাম সীমান্ত
ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম।
আগেকার দিনে গ্রামের মানুষের পালা, জারি, সারি, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, বেহুলা বা লক্ষিন্দর গানেই ছিল বিনোদনের প্রধান উৎসব। কোথাও পালাগানের আসর বসলে গ্রামের মানুষজন দলবেঁধে পালাগান শুনতে যেতো। সে সময় নন্দিপুর গ্রামে পাগলা বয়াতী নামে এক লোক বাস করতো। গান করা ছিলো তার প্রধান পেশা। দূর-দূরান্ত থেকে তার পালাগান শোনার জন্য তাকে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া হতো। একদিন পালাগান শেষে পায়ে হেঁটে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। তখন রাত প্রায় সাড়ে তিনটা হবে। শশ্মান ঘাটের রাস্তা ধরে হেঁটে চলল। আশেপাশে জনবসতির কোনো চিহ্ন নেই। চারপাশে যেন ঘন অন্ধকার। নিস্তব্ধ প্রকৃতি। রাস্তার পাশে ঝোপ-ঝাড়ের ভেতর কী যেন সুরসার শব্দ করছে। যতই সাহসের সঞ্চায় করছে ততই ভয় যেন মনে বাসা বাঁধছে।
একাকী নিরুপায় হয়ে পাগলা বয়াতীর গাঁ যেন ছমছম করছে। চোখ বন্ধ করে মনে একটু সাহস জুগিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগলেন। শশ্মান ঘাটের কাছাকাছি এসে তার গাঁ একটু শিউরে উঠল। তবুও তাকে বাড়ি পৌঁছাতেই হবে। এই দৃঢ় আশ্বাসে হাঁটি হাঁটি পা বাড়াল। শশ্মান ঘাটে এসে দেখতে পেল, অনেকগুলো বাতির আলো নাচানাচি আর ক্যাচ-ম্যাচ শব্দে মূখরিত করছে। এসব দেখে তার সব সাহস মাটিতে লুটে পড়ল। তখনই তিনি একটু থমকে দাঁড়ালেন। চোখের পলক না পড়তেই সামনে দুজন লোক এসে হাজির হয়ে বলল- ভাই আপনি এতো রাতে শশ্মান ঘাটে? সর্দার আপনাকে বুঝি নিমন্ত্রণ করেছে? তাদের উল্টোপাল্টা প্রশ্নে পাগলা বয়াতীর পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। মনে মনে ভাবতে লাগল, শুনেছি শশ্মান ঘাটে নাকি ভূতপেত্নীর আড্ডা। লোক দুটির দিকে তাকিয়ে দেখল ইয়া বড় বড় কান আর সূচালো দাঁত! পা গুলো মাটি থেকে যেন অনেক উপরে । এসব দেখে তিনি ভীষণ চিন্তায় পড়লেন। এদের হাত থেকে কীভাবে বাঁচা যায়? একটু ভাবতেই লোক দুটি বলল- ভাই কী ভাবছেন? আসুন, আমাদের নিমন্ত্রণ শুরু হয়েছে!
উপায়ান্ত না দেখে মরণ নিশ্চিত ভেবে লোক দুটির সাথে চলল। শশ্মান ঘাটে গিয়ে দেখল- চেয়ারে বসা অদ্ভূত মূর্তির একজন লোক হো-হো করে হাসছে। পাশে সারিবদ্ধ হয়ে অনেক ভয়ংকর মূর্তির মানুষগুলো কী জানি খাচ্ছে! পাগলা বয়াতীকে দেখে চেয়ারে বসা অদ্ভূত মূর্তির লোকটা বলল- কিরে পাগলা বয়াতী… আজকে কোথায় গান করলি? বাড়ি যাচ্ছিস এই বুঝি! আমাদের নিমন্ত্রণ খাবি না? বয়াতী ভয়ে জড়ো-সড়ো। মুখ থেকে একটা কথাও বেরুচ্ছে না। আবার ধমক দিয়ে বলল- নিমন্ত্রণ খাবি না। তখন বয়াতী বুঝল, এদের কথা না শুনলে বিপদ আছে। তাই বয়াতী বলল- সর্দার আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। নিমন্ত্রণ খাওয়ার জন্যই তো এসেছি। ভূতের সর্দার বলল- বয়াতীকে জল খাবার খেতে দাও? সর্দারের কথা মতো বয়াতীকে খেতে দিল। বয়াতী দেখতে পেল সেই খাবারগুলো কেমন যেন কিলবিল করে নড়ছে। ভালো করে হাত নেড়ে দেখল বিভিন্ন পোকামাকড় আর কেঁচো । পাগলা বয়াতী পড়ল মহাবিপদে। কী করবে ভেবে পাচ্ছেনা! তার মন প্রশ্ন করল, এসব কী মানুষে খায়? হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি আসল। তিনি বললেন, সর্দার এখন আর খেতে পাড়ব না, বাড়িতে ছেলে মেয়েরা না খেয়ে আছে। তাদের খাওয়াতে হবে। ভূতের সর্দার বলল- বেশ, তাই করো? পাগলা বয়াতী খাবারগুলো গামছায় বেঁধে নিয়ে বলল- সর্দার আমি এখন বাড়ি যাবো। ভূতের সর্দার বলল- বাড়ি যেতে পাড়বি তো? বয়াতী বলল- পাড়ব, তবুও একটু ভয় করছে। ভূতের সর্দার বলল- আর ভয়ের কারণ নেই, দুজন লোক তোমার সাথে করে দিচ্ছি, বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসবে।
কথামতো দুজন লোককে সাথে নিয়ে পথ চলতে লাগল। তখন পর্যন্ত পাগলা বয়াতীর ভয় কাটছে না। মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিচ্ছে বারবার। শশ্মান ঘাট অতিক্রম করে জনবসতির কাছাকাছি আাসতেই পাগলা বয়াতী পিছন ফিরে না তাকিয়ে লুঙ্গী কাছা করে দিল ভোঁ-দৌঁড়। বাড়ির সামনে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটু পিছন ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো লোক দুটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বয়াতী ভয়ে ভয়ে বলল- বাপু, এখন তোমরা চলে যা…। আমার আর কোনো ভয় নেই। তবে কথা শেষ না হতেই লোক দুটি অদৃশ্য হয়ে গেল। বয়াতী পোটলা খুলে ভূতের খাবারগুলো ফেলে দিল। আর মনে মনে ভাবল, ভূতের নিমন্ত্রণের জন্য আজ এই যাত্রায় বেঁচে গেলাম!