
মোস্তাফিজার রহমান জাহাঙ্গীর
স্টাফ রিপোর্টারঃ
সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় “মহিষ পালনে পুষ্টি, প্রজনন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তির ব্যবহার” শীর্ষক তিন দিনব্যাপী খামারী প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই), সাভার, ঢাকা কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অর্থায়নে এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেটের সহযোগিতায় এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
গত মঙ্গলবার (১৩ই জানুয়ারি ২০২৬) সকাল থেকে শুরু হওয়া প্রশিক্ষণটি বৃহস্পতিবার (১৫ই জানুয়ারি ২০২৬) সমাপ্ত হয়। তিন দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ৫০ জন নির্বাচিত মহিষ খামারী অংশগ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণের প্রথম দিনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মোঃ ফেরদৌস, সিলেট জেলার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ মিজানুর রহমান মিয়া এবং বিএলআরআই এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উক্ত প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. গৌতম কুমার দেব। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাঃ মোঃ ইকবাল হোসেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহাপরিচালক বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে লাভজনক মহিষ পালনে প্রযুক্তি ব্যবহারের গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিষয়ে আলোচনা করেন। বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে মহিষ থেকে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং খামারি আর্থিকভাবে লাভবান হয়। উন্নত জাত নির্বাচন, কৃত্রিম প্রজনন, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে রোগ কমানো সম্ভব। সাইলেজ ও ইউএমএস ব্যবহারে খাদ্য সংকট দূর হয় এবং আধুনিক শেড ও পরিষ্কার পরিবেশ মহিষের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে প্রাণী চিকিৎসা ও খামার ব্যবস্থাপনা সহজ হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা প্রযুক্তিনির্ভর মহিষ পালনকে উৎসাহ দিচ্ছে, তবে এখনও অনেক খামারির প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। তাই লাভজনক ও টেকসই মহিষ পালনের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

প্রকল্প পরিচালক বলেন মহিষ পালন দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুধ, মাংস ও চামড়া সরবরাহের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি মহিষ পালনের মাধ্যমে কৃষক ও খামারির আয় বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। বিশেষ করে বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করলে উৎপাদন বৃদ্ধি ও লাভজনকতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আজিজুন্নাহার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট। তিঁনি উদ্যোক্তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মহিষ পালনের সম্ভাবনা বিষয়ে আলোচনা করেন। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মহিষ পালন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মহিষ পালনের জন্য উপযোগী হওয়ায় অল্প খরচে খামার স্থাপন করা যায়। মহিষ পালন থেকে দুধ উৎপাদন, পশু পরিচর্যা ও খামার ব্যবস্থাপনায় সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও গোবর সার উৎপাদনের মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পায় মহিষের দুধের উচ্চ বাজারমূল্য তরুণদের নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি করে।
প্রশিক্ষণের তৃতীয় দিন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা দুগ্ধ খামারের উপপরিচালক মোঃ শহীদুল ইসলাম। তিঁনি বলেন মহিষ উৎপাদনে আন্তঃপ্রজনন একটি বড় সমস্যা, যার ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এই সমস্যা সমাধানে নির্দিষ্ট সময় পর পর প্রজনন ষাঁড় পরিবর্তন করা প্রয়োজন, যাতে জেনেটিক বৈচিত্র্য বজায় থাকে। কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি ব্যবহারে উন্নত জাতের বীর্য ব্যবহার করে গুণগত বংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব। পাশাপাশি ইস্ট্রাস সিনক্রোনাইজেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে একই সময়ে মহিষের হিট নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক সময়ে প্রজনন নিশ্চিত করা যায়। এসব প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে প্রজনন দক্ষতা ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা লাভজনকভাবে মহিষ পালন, উন্নত জাত নির্বাচন, প্রজনন ব্যবস্থাপনা, স্বল্প খরচে দুধালো মহিষের পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, সুষম দানাদার খাদ্য মিশ্রণ, সাইলেজ ও ইউএমএস তৈরির কৌশল, গর্ববতী ও দুগ্ধবতী মহিষের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থাপনা, টিকা ও কৃমি নিয়ন্ত্রণসহ মহিষের স্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
প্রশিক্ষণ কোর্সের সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন বিএলআরআই এর মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ কামরুল হাসান মজুমদার।
খামারীরা প্রশিক্ষণ শেষে জানান, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেকসই ও লাভজনক মহিষ খামার গড়ে তোলার বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পেয়েছেন। একই সঙ্গে তারা মহিষের গুরুত্বপূর্ণ রোগের টিকা ও উন্নত জাতের বীজ সহজলভ্য করার আহ্বান জানান।