
অনলাইন ডেক্স:
রাত তখন গভীর। ঢাকার এক পুরোনো মহল্লার ছোট্ট এক কামরার বাসায় বসে আছেন সেলিম সাহেব। তার একমাত্র মেয়েটা পাশের ঘরে পড়ছে। কম্পিউটারের মনিটরের নীল আলোয় তার মুখটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। ব্যাংকে তার চাকরিটা এখন নড়বড়ে।
আজকাল প্রায়ই শুনতে পান, তাদের অনেক কাজ নাকি এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) করে ফেলছে। ডাটা এন্ট্রি, সাধারণ হিসাব-নিকাশ সব নাকি চ্যাটবট আর স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারে চলে যাচ্ছে। তার মুখে চিন্তার ভাঁজ। তিনি ভাবছেন, যদি হঠাৎ করে তার চাকরিটা চলে যায়, তাহলে এই শহরের কঠিন বাস্তবতা আর তার মেয়ের স্বপ্ন কীভাবে সামাল দেবেন?
এটা কেবল সেলিম সাহেবের গল্প নয়, এই গল্পের মধ্য দিয়ে দেশের হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের নীরব আর্তনাদ যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামের এই নতুন ঢেউ, যা একসময় সিনেমার কল্পবিজ্ঞান বলে মনে হতো, আজ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এটি কেবল প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, এটি এক সামাজিক ভূমিকম্প, যা আমাদের জীবন, সমাজ এবং পুরো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
গল্পের প্রেক্ষাপটে, সেলিম সাহেবের মতো লাখো মানুষ আজ এক ধরনের নীরব আতঙ্কে ভুগছেন। গত এক দশকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে (গার্মেন্টস) অটোমেশনের ঢেউ এসেছে। এর ফলে প্রায় ৫% কর্মসংস্থান কমে গেছে, কারণ স্বয়ংক্রিয় মেশিনগুলো মানুষের হাতের কাজগুলো দ্রুত আর নিখুঁতভাবে করতে পারছে। কিন্তু এটা ছিল মাত্র শুরু।
এখন এই পরিবর্তন এসেছে অফিস-আদালতে, কল সেন্টারে, এবং এমনকি সৃষ্টিশীল পেশাতেও। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ডেটা অ্যানালাইসিস, অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কাস্টমার সার্ভিস এজেন্টের মতো পেশাগুলোতে এখন এআই চ্যাটবট ও স্বয়ংক্রিয় টুল ব্যবহার হচ্ছে। এই পরিবর্তন মধ্যম আয়ের পেশাদারদের মধ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যা তাদের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ভবিষ্যতের চিত্রটা আরও ভয়ংকর হতে পারে। আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে প্রায় ৪০% পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ (repetitive tasks) বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে। এটা শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি চরম বাস্তবতা। যদি আমাদের তরুণ প্রজন্ম নতুন দক্ষতা অর্জন না করে, তাহলে দেশের শিক্ষিত বেকারত্ব আরও চরম আকার ধারণ করবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত? নাকি আমরা এখনো গতানুগতিক শিক্ষা নিয়েই পড়ে আছি, যা ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না?
এই সমস্যার সমাধান না হলে এর প্রভাব শুধু কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমাজের গভীরে প্রবেশ করবে। বর্তমানেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তরুণরা, বিশেষ করে যারা গতানুগতিক ডিগ্রি নিয়ে পড়াশোনা করছে, তারা দেখছে যে তাদের পড়ালেখা করা বিষয়গুলো আর বাজারে তেমন চাহিদা তৈরি করছে না। তারা চাকরির বাজার নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে। একইসঙ্গে, শিশুরা স্মার্টফোন এবং এআই-চালিত গেমসের প্রতি আসক্ত হচ্ছে, যা তাদের সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ভবিষ্যতে প্রতিটি সেক্টরের মানুষের জীবনে এই প্রভাব পড়বে। একজন চিকিৎসক যখন এআই ডায়াগনস্টিক টুলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হবেন, তখন তার মানবিক স্পর্শ এবং অভিজ্ঞতা কি মূল্য হারাবে? একজন প্রকৌশলী যখন এআই-চালিত ডিজাইন সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হবেন, তখন তার সৃজনশীলতা কোথায় থাকবে? এই পরিবর্তনগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এতটাই ঢুকে পড়বে যে, আমরা হয়তো এর মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় উপলব্ধি করতে পারব না। এই পরিবর্তনের ঢেউ কি আমাদের মানবিকতাকে গ্রাস করবে?
এই ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র সরকার বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিছু দায়িত্বশীল সংগঠন এবং ব্যক্তি উদ্যোগী হয়ে কাজ করছেন। তারা স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য কোডিং কর্মশালা আয়োজন করছেন, তরুণদের ডেটা সায়েন্স শেখাচ্ছেন, এবং এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরছেন। এই উদ্যোগগুলোই একটি নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপন করছে।
এই পরিবর্তনকে শুধু প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি মানবিক সংকট। আমরা কি শুধুমাত্র যন্ত্রের মতো কাজ করব, নাকি আমরা আমাদের মানবিক সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে যন্ত্রকে পরিচালনা করব? আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখনই সৃজনশীলতা এবং এআই-সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে, যেমন কোডিং, ডেটা সায়েন্স এবং রোবটিকস। এটাই হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করার একমাত্র পথ।
এই সংকট একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা, এবং সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা সম্ভব। আমাদের এখনই একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যা ভবিষ্যতে আকস্মিক কর্মসংস্থান বিপর্যয় মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে। এই রোডম্যাপে থাকতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং এআই-সম্পর্কিত গবেষণায় বিনিয়োগ। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সবার মধ্যে এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যাতে আমরা প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি।
এই পরিবর্তন যেন আমাদের ভীত না করে, বরং আমাদের আরও শক্তিশালী করে তোলে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের সৃজনশীলতা, মানবিকতা এবং সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা এআইয়ের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের এই শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
“ভয় পেয়ো না, আলোর ঝর্ণা নামছে যখন অন্ধকার সরিয়ে,
বিদ্রোহ করো, তোমার সৃজনশীলতাই নতুন সূর্য আনবে,
নতুন পথের পথিক হও, এই নতুন বিশ্বে,
ভবিষ্যৎ তোমারই, যদি তুমি চাও!”
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব,
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি